জুমার নামাজের খুতবা কি অত্যাবশ্যক? খুতবা ছাড়া জুমার নামাজ হবে কি?



মো: শাহ জালাল




প্রশ্ন: জুমার নামাজের খুতবা কি অত্যাবশ্যক? কেউ যদি খুতবা ছাড়া জুমার নামাজ পড়ে কিংবা অনারবি ভাষায় খুতবা প্রদান করে, তাহলে জুমার নামাজ আদায় হবে কি?

উত্তর: খুতবা শব্দের অর্থ ভাষণ বা বক্তৃতা শ্রোতাদের উদ্যেশ্যে কোন বিষয়ে দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যকে খুতবা বলে

(مخاطبة الجمهور ومحاولة إقناعهم للتأثير عليهم)

খুতবার উপস্থাপনা, শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি সাধারণ পাঠরীতি ও আলোচনা থেকে আলাদা। বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে রাসুল (সা.) এর খুতবা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়ছে:

 كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ وَعَلَا صَوْتُهُ وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ حَتَّى كَأَنَّهُ مُنْذِرُ جَيْش-

রাসুল (সা.) যখন খুতবা দিতেন, তখন তাঁর চোখ লাল হয়ে যেত। তাঁর কন্ঠস্বর দরাজ ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠত এবং তাঁর ক্রোধ প্রবল আকার ধারণ করত। মনে হত, তিনি যেন কোন সামরিক অভিযানের বিষয়ে সতর্ক করছেন’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৩৫)।

জুমার নামাজের জন্য খুতবা অত্যাবশ্যক কি না- এ ব্যাপারে ইমামদের মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শফিয়ি ও আহমদ সহ অধিকাংশ ইমামদের নিকট জুমার নামাজের জন্য খুতবা অত্যাবশ্যক। কারণ, পবিত্র কুরআনে খুতবা শুনার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়ছে। ইরশাদ হচ্ছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُون-

‘হে ইমানদারগণ, যখন জুমার নামাজের আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা ‘আল্লাহর যিক্‌র’ এর (খুতবা অথবা নামাজ) প্রতি তাড়াতাড়ি আস এবং ব্যবসা বানিজ্য বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর-যদি তোমরা বুঝতে’! (সুরা আল-জুমুয়াহ, আয়াত ৯)।

এ ছাড়া রাসুল (সা.) খুতবা ছাড়া কখনো জুমার নামজ আদায় করেননি অতএব খুতবা ছাড়া জুমার নামাজ পড়লে তা আদায় হবে না। তবে হাসান বাসরি ও ইবনে হাজমের মতে  জুমার নামাজের জন্য খুতবা অত্যাবশ্যক নয়। বরং এটি একটি সুন্নাত কাজ। তাই তাদের মতে খুতবা ছাড়াও জুমার নামাজ আদায় হবে। কারণ যে ব্যক্তি খুতবা শুনেনি কিন্তু জুমার জামাতে অংশ গ্রহণ করেছে, তার জুমার নামাজ সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ আমাদের বিবেচনায় দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথম মতটিই শক্তিশালী। তাই এর ওপরই আমল করা উচিৎ।

জুমার নামাজের খুতবা আরবিতে হওয়া উত্তম, এতে কোন দ্বিমত নেই। তবে আরবি ভাষা শর্ত কি না- সে বিষয়েও ইমামদের একাধিক মত রয়েছে।

১. ইমাম মালিক ও আহমদের প্রসিদ্ধ মতে খুতবা অবশ্যই আরবি ভাষায় হতে হবে। শ্রোতারা অনারব হলেও আরবি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় জুমার খুতবা বৈধ নয়। কারণ, রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিগন আরবিতেই খুতবা প্রদান করেছেন। পরবর্তিতে মুসলমানগন অনেক অনারব দেশ জয় করেছেন। সেখানে তারা জুমার নামাজ পড়িয়েছেন। কিন্তু তাদের কেউই আরবি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় খুতবা দিয়েছেন- এমন প্রমান নেই। এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে খুতবাকে ‘যিক্‌র’ নামে অবিহিত করা হয়েছে। আবার কোন কোন হাদিসের বর্ণনায় খুতবাকে যোহরের চার রাকাত ফরজের দুই রাকাতের স্থলাভিসিক্ত বলে উল্লেখ করা হয়ছে। আর যিক্‌র ও নামাজের কোনটিই আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় বৈধ নয়। সুতরাং খুতবাও আরবি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় বৈধ নয়।

২. ইমাম আবু হানিফার মতে খুতবার জন্য আরবি ভাষা শর্ত নয়। অন্য কোন ভাষায় খুতবা দিলেও তা বৈধ হবে। এ সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের ফাতওয়া বিষয়ক বিখ্যাত ‘তাতারখানিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:

ولو خطب بالفارسية جاز عند أبي حنيفة على كل حال، وروى بشر عن أبي يوسف: إذا خطب بالفارسية وهو يحسن العربية لا يجزيه، إلا أن يكون ذكر الله في ذلك بالعربية في حرف أو أكثر من قبل أنه يجزي في الخطبة ذكر الله تعالى

‘যদি কেউ ফার্সি ভাষায় খুতবা দেয়, তাহলে আবু হানিফার মতে তা সর্বাবস্থায় বৈধ। আর বিশ্‌র আবু ইউসুফ থেক বর্ণনা করেছেন যে, যদি তিনি (বক্তা) আরবিতে পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও ফার্সি ভাষায় খুতবা দেন, তাহলে তা বৈধ হবে না। তবে তিনি যদি খুতবার কোন অংশে আল্লাহর যিক্‌র (যেমন সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি) বা এর চেয়ে বেশী কিছু অংশ আরবিতে বলেন, তাহলে ‘খুতবার মধ্যে আ্ল্লাহর যিক্‌রই যথেষ্ঠ’ এ যুক্তিতে তা বৈধ হবে’ (আল-ফাতাভি আল-তাতারখানিয়াহ, ২য় খন্ড, ৬০ পৃষ্ঠা)।

ইমাম আল-সারখাসি তাঁর আল-মাবসুত গ্রন্থে বলেন:

 وَأَصْلُ هَذِهِ الْمَسْأَلَةِ إذَا قَرَأَ فِي صَلَاتِهِ بِالْفَارِسِيَّةِ جَازَ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ وَيُكْرَهُ، وَعِنْدَهُمَا لَا يَجُوزُ إذَا كَانَ يُحْسِنُ الْعَرَبِيَّةَ، وَإِذَا كَانَ لَا يُحْسِنُهَا يَجُوزُ... وَكَذَلِكَ الْخِلَافُ فِيمَا إذَا تَشَهَّدَ بِالْفَارِسِيَّةِ أَوْ خَطَبَ الْإِمَامُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ بِالْفَارِسِيَّةِ.

‘এ মাসয়ালাটি নামাজের কেরাতের সাথে সম্পর্কিত। কেউ যদি ফার্সি ভাষায় নামাজের কেরাত পড়েন, তাহলে আবু হানিফার মতে তা জায়েজ কিন্তু মাকরুহ। আর আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে যদি সে আরবি জানে, তাহলে তা বৈধ হবে না। কিন্তু আরবি না জানলে তা বৈধ হবে।... অনুরূপ ভাবে কেউ যদি ফার্সি ভাষায় ‘তাশাহুদ’ পড়েন, কিংবা ইমাম সাহেব ফার্সি ভাষায় জুমার খুতবা প্রদান করেন, তাহলে সে বিষয়েও আবু হানিফার সাথে তাদের দ্বিমত রয়েছে’ (আল-মাবসুত, ১ম খন্ড, ৯৯ পৃষ্ঠা)

ইমাম ইবনুল আবিদিন তাঁর ‘রাদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলেন:

 لَمْ يُقَيِّدْ الْخُطْبَةَ بِكَوْنِهَا بِالْعَرَبِيَّةِ اكْتِفَاءً بِمَا قَدَّمَهُ فِي بَابِ صِفَةِ الصَّلَاةِ مِنْ أَنَّهَا غَيْرُ شَرْطٍ وَلَوْ مَعَ الْقُدْرَةِ عَلَى الْعَرَبِيَّةِ عِنْدَهُ خِلَافًا لَهُمَا حَيْثُ شَرَطَاهَا إلَّا عِنْدَ الْعَجْزِ

‘ইমাম আবু হানিফার মতে আরবি ভাষায় সক্ষমতা থাকলেও খুতবা আরবিতে দেওয়া শর্ত নয়- যেমনটি ‘নামাজের পদ্ধতি’ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়ছে। তবে ইমাম  আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে এটি শর্ত। কিন্তু আরবি না জানলে তাও বৈধ’ (রাদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৭৬ পৃষ্ঠা)।

ইমাম আবু হানিফার যুক্তি হলো খুতবার উদ্যেশ্য হল মানুষকে উপদেশ দেওয়া। আর তা যে কোন ভাষায় সম্ভব। এ ছাড়া আল্লাহ তায়লা সকল নবীকেই মাতৃভাষায় প্রেরণ করেছেন। তারা তাঁদের মাতৃভাষাতেই খুতবা দিয়েছেন এবং দ্বীনের প্রতি মানুষকে আহবান করেছেন। হযরত মুহম্মাদ (সা.)ও এর ব্যতিক্রম নন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ-

‘আমি সকল রাসুলকে তাঁদের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি- যাতে তাঁরা তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারেন’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত নং ৪)। আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন:

لَمْ يَبْعَثْ اللَّهُ نَبِيًّا إِلا بِلُغَةِ قَوْمِهِ

‘আল্লাহ  সকল নবীকে তাঁদের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন’ (মুসনাদু আহমদ, হাদিস নং ২০৪৪১)

রাসুল (সা.) ও সাহাবিগন আরবিতে খুতবা দিয়েছেন- এই যুক্তিতে খুতবাতে আরবির শর্তারোপ করা সঙ্গত নয়। কারণ তাঁরা তাদের মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন। এ ছাড়া  রাসুল (সা.) ও সাহাবিগণ না দেখে খুতবা দিয়েছেন। যদি তাদের কর্ম ওয়াজিব বুঝাতো, তাহলে না দেখে খুতবা দেওয়া ওয়াজিব হতো। কিন্তু এটি কেউ বলেননি।

খুতবাকে নামাজ বা যিক্‌রের উপর কিয়াস করা ঠিক নয়। কারণ নামাজ ও যিক্‌র আলাদা ইবাদত। এ ছাড়া খুতবা ও নমাজের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। এ প্রসঙ্গে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম আল-সারখাসি বলেন:

 وَالْأَصَحُّ أَنَّهَا لَا تَقُومُ مَقَامَ شَطْرِ الصَّلَاةِ فَإِنَّ الْخُطْبَةَ لَا يَسْتَقْبِلُ الْقِبْلَةَ فِي أَدَائِهَا وَلَا يَقْطَعُهَا الْكَلَامُ وَيُعْتَدُّ بِهَا وَإِنْ أَدَّاهَا وَهُوَ مُحْدِثٌ أَوْ جُنُبٌ فَبِهِ تَبَيَّنَ ضَعْفُ قَوْلِهِ أَنَّهَا بِمَنْزِلَةِ شَطْرِ الصَّلَاةِ-

‘বিশুদ্ধ মতে খুতবা (যোহর) নামাজের অর্ধেক বিবেচিত হতে পারে নাকারণ খুতবা কেবলামূখী হয়ে দিতে হয় না (কন্তু নামজ কেবলামূখী হয়ে পড়তে হয়), খুতবার মাধ্যে কথা বললে তা ভঙ্গ হয় না (কিন্তু নামাজের মধ্যে কথা বললে তা ভঙ্গ হয়ে যায়) এবং ওজু বা গোসল ছাড়া খুতবা দিলেও তা বৈধ বলে গণ্য হয় (কিন্তু ওজু বা গোসল ছাড়া নামাজ বৈধ হয় না)। অতএব, ‘খুতবা নামাজের অর্ধেকের স্থলাভিষিক্ত’ এ বক্তব্যটি একটি দূর্বল মত’ (আল-মাবসুত, ২য় খন্ড, ২৪ পৃষ্ঠা)

৩. ইমাম শাফিয়ি, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতে খতীব বা বক্তা যদি আরবি জানেন এবং শ্রোতাদের অধিকাংশ তাঁর বক্তব্য বুঝতে পারেন, তাহলে খুতবার জন্য আরবি ভাষা শর্ত। কিন্তু বক্তা যদি আরবি না জানেন কিংবা শ্রোতাদের অধিকাংশ তাঁর বক্তব্য না বুঝেন, তাহলে প্রয়োজনের কারণে অনারবি ভাষায়ও খুতবা প্রাদান বৈধ। তাঁরা উপরোক্ত প্রথম ও দ্বিতীয় মতের প্রমাণগুলো সমন্বয় সাধন করেছেন।

আমাদের বিবেচনায় উপরোক্ত তৃতীয় মতটি অধিক যুক্তিযুক্ত। তবে খুতবার মৌলিক বিষয়গুলো যেমন: আল্লাহর প্রশংসা, রাসুল (সা.) এর প্রতি দুরুদ এবং প্রাসঙ্গিক আয়াত ও হাদিস আরবিতে উপস্থপন করে এর বিষয়বস্তু মাতৃভাষায় বলা যেতে পারে। এতে করে আলোচনা কুরআন ও হাদিসের মধ্য সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সাধারণ মানুষ তা থেকে উপকৃত হবে। কোন অবস্থাতেই এটাকে মুসলমানদের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম বানানো যাবে না।

  

 


মাসিক দাওয়াহ জুমুয়া নামাজ খুতবা