আমি কেন ও কীভাবে 'খৃষ্টান-কাফিরদের' দেশ বৃটেনের নাগরিক হলাম-০৩



ড. আবুল কালাম আজাদ




আমি কেন ও কীভাবে 'খৃষ্টান-কাফিরদের' দেশ বৃটেনের নাগরিক হলাম

তৃতীয় পর্ব

 

২০০৪ সালেই আমার পিএইচডি শেষ হয় তবে, কনভোকেশান হয় ২০০৫ সালের মে মাসে আমি ২০০৩ সালে এসে আমি স্টুডেন্ট ভিসা শেষ হলে এই স্কুলের ওয়ার্কপার্মিট নিয়ে নেই জানি না, আমার এই সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক ছিলো তবে, এটার জন্যে আমার কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না আমি এখান থেকে যে কোন সময় যে কোন যায়গাতেই চলে যেতে পারি তবে, এই স্কুলের আমার ছোট বেলার সাথী আব্দুর রহমান প্রিন্সিপ্যাল হয়ে আসাতে এখানেই উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু করার খুব ইচ্ছা ছিলো এখানে কলেজ শাখা খোলা হলো, যার প্রধান ছিলাম আমি এখান থেকে আমাদের ছাত্ররা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য টপ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করলো আমি খুব অনুপ্রাণিত হলাম এই অনুপ্রেরণা আমার দিক পরিবর্তন করে দিলো ভাবলাম, এই প্রতিষ্ঠানকে যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা হবে একটা ঐতিহাসিক কাজ এই দেশে এই দেশে ইসলামী শিক্ষার মান সম্পন্ন কোন উচ্চতর বিদ্যাপীঠ নাই দেওবন্দের আদলে কিছু দারুল আছে যেগুলোর মান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারে কাছেও নাই

আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের নাম হলো জামেয়াতুল উম্মাহ (আল-উম্মাহ বিশ্ববিদ্যালয়), কিন্তু এটা শুধু কলেজ পর্যন্ত- লেভেল এর পরে আর কিছু নেই এটাকে নামের বিশবিদ্যালয় থেকে কামের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার জন্যে আমি বা আমরা সব প্লান করে রেখেছিলাম ইসলামী জগতের অনেক বড় বড় স্কলারদের সমন্বয়ে একটা শক্তিশালী একাডেমিক কাউন্সিলও করেছিলাম এগুলো করতে করতে ২০১০ সাল পার হয়ে যায় আমি আমার পরিবারের সদস্যরা এর মধ্যে বৃটিশ নাগরিক হয়ে যাই

আমি আসলে বৃটেনে থাকার জন্যে বৃটিশ হই নি এখানে ইউনিক কিছু করার নিয়তে বৃটিশ হয়েছি কারণ বাংলাদেশী হয়ে সেগুলো হয়ত করা সম্ভব ছিলো না বাংলাদেশ নামক দেশের প্রতি আমার গভীর টান ভালোবাসা ছিলো আছে এবং আশাকরি থাকবেও ইনশাআল্লাহ তবে, বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে না ফেরার এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাংলাদেশের সামগ্রিক কিছু নেতিবাচক পরিবর্তনও এর পেছনে কাজ করেছে

বৃটেনে ইসলামী শিক্ষার ওপর কিছু করার বিশাল স্বপ্ন এবং বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে দেশে ফিরে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাটা একেবারে চুপসে যায় আমি ২০০০ সালে ইংল্যান্ডে আসার পর বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে বেড়াতে গেছি যতবার দেশে গেছি, দেশের ব্যাপারে চরম হতাশা নিয়ে এসেছি আমি লক্ষ্য করেছি- অল্প সময়ে ব্যবধানে বাংলাদেশের মানুষের স্বভাব, চরিত্র রুচির অনেক অবনতি হয়েছে যে দেশের মানুষ আইন ভাংগাকে নিজের শক্তির প্রমাণ হিসাবে দেখে এবং ন্যায় বিচারকে দূর্বলতা মনে করে সে দেশের নৈতিক ভিত্তি যে কত নড়বড়ে তা সামান্য বিবেচনা সম্পন্ন লোকেও বুঝতে পারেন

বাংলাদেশ একটা মুসলিম প্রধান দেশ কিন্তু সেখানে ইন্সাফের বড় অভাব আমি নিজেও ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসলামদের পরিচালিত কয়েকটা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেছি সেখানেও হতাশ হয়েছি  আমার কাছে মনে হয়েছে- ইসলামের মহান শিক্ষাকে অনেকেই নিজেদের কাজে, চরিত্রে পেশায় বাস্তবায়ন না করে ইসলামকে সাইনবোর্ড হিসাবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার একটা প্রবণতা প্রায় সবখানেই প্রতীয়মান প্রায় সবার কাছে পদ টাকার মূল্যটাই যেন সবচেয়ে বড় ফলে, দলীয় অন্ধত্বটা সবখানেই চরম প্রভাবশালী মেধা, যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতার মূল্য যেন একেবারেই নেই আমি এসব দেখে দেশে ফেরার প্রেরণা একেবারেই হারিয়ে ফেলি কারণ আমি সব সময় একটা উম্মাটিক মন-মানসিকতা লালন করি এবং বিশ্বাস করি- আমরা সকল মুসলমান একই দল দিলের সদস্য আর তা হলো ইসলাম আমি মনে করে ইনসাফ ন্যায়-নীতি হলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে উত্তম রক্ষা কবচ সুশাসন ন্যায় বিচারের যেখানে অভাব থাকে সেখানে পশুত্বই রাজত্ব করে আমাকে একটা পর্যায়ে এসে (২০১২-২০১৩ সালের দিকে) সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে বাংলাদেশে ফিরে এসে আমি তেমন কিছুই করতে পারব না আমার চিন্তা-চেতনা কাজের ধরণের সাথে আমি কম্প্রোমাইজ করে দেশে টিকতে পারব না

বৃটেনে মুসলিমরা সংখ্যালঘু কিন্তু এখানে এখনো ন্যায়-নীতি আছে শিক্ষা যোগ্যতার মূল্য মূল্যায়ন আছে, এখানে এখনো মনুষ্যত্ব আছে, এখানে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার লোক আছে এখানে মিথ্যা বলাকে অধিকাংশ লোক ঘৃণা করে আমি এখানে  আছি প্রায় বিশ বছর কত বড় বড় কাজ করলাম সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে একটা পয়সা ঘুষ দেওয়া বা নেওয়ার কথা কেউ চিন্তাও করে নি বা করে না ফোনে বা ইমেইলে যোগাযোগ করেও অনেক বড় বড় কাজও করা যায় শুধু একটা উদাহরণ দেই

আমি যখন আমাদের সেকেন্ডারী স্কুলকে লেভেল বা কলেজ পর্যায়ে নিয়ে যাই তখন ইমেইলে যোগাযোগের মাধ্যমেই খুব সহজভাবেই শিক্ষা অধিদফতর আমাদের অনুমতি দিয়ে দেন এভাবে, অনেক কাজ কর্মে এখানে অনেক সিস্টেম আছে এবং সে অনুযায়ী চলে অধিকাংশ মানুষই সিস্টেম অনুযায়ী চলতে পছন্দ করেন এবং এটাকে সম্মান করেন

আমাদের দেশের লোকেরা ওয়াজ করতে ওয়াজ শুনাতেই বেশী পছন্দ করেন কারণ খুব কম লোকই সিস্টেম অনুযায়ী চলতে পছন্দ করেন আম

আমি বৃটিশ হইনি শুধু এদের সুশাসন ব্যবস্থাপনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বা এদের ন্যায়-পরায়নতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্যে বরং বৃটিশ হলাম মুসলিম দেশগুলো অনৈতিক ইসলামি চরিত্রের জন্যে এবং মাস্তানী চরিত্রের জিঘাংসার ভয়ে আমার ভাবতেই অবাক লাগে- ইসলামের এতো সৌন্দয্য থাকতেও মুসলমানদের দেশ পাপ-পঙ্কিলতা বন্যতা দিয়ে ভরা কেনো যারা পরিবর্তন করার কারিগর, তারাই যদি পরিবর্তনের পথে অন্তরায় হন, সেখানে আমার মত সহজ-সরল মানুষেরা অবশ্যই স্বস্তি পাবে না

আল্লাহ আমাকে বাংগালী বা বাংলাদেশী করে পাঠিয়েছেন এটা আল্লাহর চয়েস আমি এতে অবশ্যই পরম সুখী আমি আমার জাতীয় পরিচয়ে এতো বেশি খুশী যে আমাকে লোকেরা অবাংগালী ভাবলেও আমি নিজ থেকেই পরিচয় দেই আমি বাংলাদেশের যদিও ধারণা করা হয় আমার নানার পূর্ব-পুরুষেরা অবাংগালী ছিলেন আমার বৃটিশ-জন্ম সন্তানদেরকে বলি- তোমরা হাজার বছর এই দেশে থাকলেও তোমরা কখনোই ইংরেজ হবে না আমার ছেলে-মেয়েদেরকে বাংলা শিখিয়েছি তাঁরা বাংলা লিখতে, বলতে পড়তেও পারে আমি এতো কথা বলছি মনের ভেতর একটা গভীর কষ্টের কারণে

জন্মেছি বাংলাদেশে, বাংলাদেশী হয়ে আমি কেন অন্যদেশের পাসপোর্ট বুকে নিয়ে ঘরবো যদিও বৃটিশ পাসপোর্ট নিয়ে বেড়ালে বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশানে ভিন্নরকমের ব্যবহার পাওয়া যায় আমাদের খাছলতের কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীকে খুব নিচু দৃষ্টিতে দেখা হলেও বৃটিশ পাসপোর্ট নিয়েও কিন্তু আমি খুব বেশী সম্মানিত বোধ করি না

আমার মনে আছে- বৃটিশ পাসপোর্ট হওয়ার পর যখন বাংলাদেশে বেড়াতে গেলাম তখন ঢাকা এয়ারপোর্টে বিদেশীদের কাতারে দাড়ালাম মনের দুঃখে ওখানেই বলে ফেললাম-

(চলবে, ইনশাআল্লাহ)

 


মাসিক দাওয়াহ বৃটেন খৃষ্টান