রামাদান ও সিয়ামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর ব্যবহৃত কিছু পরিভাষা



ড. আবুল কালাম আজাদ





রামাদান ও সিয়ামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর ব্যবহৃত কিছু পরিভাষা
ডঃ আবুল কালাম আজাদ, লন্ডন 


আমরা ভারতবর্ষের মুসলিমরা দীর্ঘকাল মোগল ও উসমানীয় তুর্কী শাসনের অধীনে থাকার কারণে আমাদের কৃষ্টি-সভ্যতা, ভাষা-সাহিত্য, বিশ্বাস ও আমলে ইরানী, ফার্সী ও তুর্কী প্রভাব অনেক বেশী। আমরা ইসলামী জীবনের অনেক  মৌলিক শব্দ ব্যবহার করি যেটা আমরা মূলত পেয়েছি আল্লাহর কিতাব কোরআন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম থেকেই, যা কি-না আরবি ভাষায়। কিন্তু আমরা নিজেদের অজ্ঞতা হোক বা যে কারণেই হোক সে আসল আরবি পরিভাষাগুলো বাদ দিয়ে অন্য ভাষার পরিভাষা ব্যবহার করে আসছি বহুকাল। যেমন- আল্লাহ শব্দটাও আমরা পরিবর্তন করে খোদা বানিয়ে ফেলেছি, সালাতকে বানিয়েছি নামায, সিয়ামকে বানিয়েছি রোজা। অথচ আমরা প্রতিদিন এগুলো আরবিতেও পড়ি কোরআন ও সুন্নাহতে। 
হয়ত বলবেন- আমাদের আকাবের, পীর-ময়-মুরুব্বীরা যুগ যুগ ধরে এগুলো বলে এসেছেন, আর তাঁরা ছিলেন আল্লাহর খাস বান্দা, আল্লাহর ওলী। তাঁরা  এগুলো বললে যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে আমরা বললে অসুবিধা হবে কেন? সহজ উত্তর হলো- আমাদের ভাষাটাও হোক সরাসরি আল্লাহ ও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম), অন্য কারো নয়। কারণ যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, তাঁরা বা তাদের মুখের ভাষাটাও ভালোবাসি। যে শব্দটা আমার রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম) মুখ থেকে বের হয়েছে, আমিও চাই আমার মুখ থেকে সে শব্দগুলো বের হোক। আমাদের মুরুব্বিরা ভুল করেছেন বলব না। এতটুকু বলব যে- আমরা সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর কাছে ও তাদের ভাষার কাছেই থাকতে চাই। এটা ইমান-আকীদা ও আমলের দিক দিয়ে অনেক ভালো ও নিরাপদ। 
আরেকটা কথা বলি- আপনার নাম যদি আরবিতে হয় আর আপনার পীর বা শায়খ যদি সেটা অনুবাদ করে ফার্সি বা উর্দুতে ডাকেন, আপনি কি খুশী হবেন? আপনি বরং রেগে যাবেন। কারণ আপনি এটাকে বলবেন আপনার নামটাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। 

মনে রাখতে হবে- আরবি ভাষার পরিভাষা ও সেগুলো অন্যভাষায় অনূদিত পরিভাষা নিশ্চয় এক হবে না। ফলে, এখন সময় এসেছে- আমরা সচেতন মুসলিমরা আবার আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর ব্যবহৃত আসল শব্দ ও পরিভাষাগুলো ব্যবহার করব। আজকে রামদান ও সিয়ামের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু আরবি পরিভাষা আমরা জানাব এবং তা এই রামাদান থেকে ব্যবহার করার চেষ্টা করব। 
১- আমরা বলব- রামাদান, রমজান বলব না। 
আল্লাহ নিজেই রামাদান শব্দ ব্যবহার করেছেন কোরআনে। দেখুন সূরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৫। আর হাদীস শরিফে রামাদান শব্দটা এসেছে প্রায় ৪০০০ বার। 
আরবিতে রমজান কেউ বলে না, রমজান বলে ফার্সি, তুর্কি, কুর্দি, পশতু ও উর্দু ভাষায়। আমাদের কোরআন ও হাদীসের ভাষা আরবি থাকতেও আমরা কেন রামাদান পরিবর্তন করে রমজান বলতে যাব? 
আমরা বলব- রামাদান মুবারক। কারণ এটাই হাদীসে এসেছে। অনেকেই বলেন রামাদান কারীম। কিন্তু আরবিতে কোরআন বা সুন্নাহতে রামাদান কারীম পরিভাষা ব্যবহার হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় নি। শায়খ মুহাম্মাদ বিন উসাইমীন বলেন- রামাদান কারীম বলবেন না, বলবেন রামাদান মুবারক। কারণ রামাদান মাসটা নিজে আমাদেরকে এমন কিছু দেয় না যে সে সম্মানিত, বরং আল্লাহ এই মাসে বরকত দিয়েছেন, তাই এটাকে রামাদান মুবারক বলতে হবে। (মাজমু আল-ফাতাওয়া ২০/৯৩/৪৫২)। 
২- আমরা বলব সিয়াম বা সাওম, রোজা বলব না।  
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে ৭ জায়াগাতে সিয়াম শব্দ ব্যবহার করেছেন। আর সাওম শব্দ ব্যবহার করেছেন ১ জায়গায়। আর হাদীসের প্রায় ১৮৮১ জায়গায় সাওম শব্দ এসেছে। আর সিয়াম শব্দ এসেছে ২৪৩১ বার। 
তাহলে দেখা যাচ্ছে- আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এর অধিক ব্যবহৃত পরিভাষা হলো সিয়াম। সাহাবারাও সিয়াম পরিভাষাটা বেশি ব্যবহার করতেন। তাহলে, আমরা এটা বাদ দিয়ে কেন রোযা শব্দ ব্যবহার করতে যাব? 
রোজা মানে দৈনিক বা দিনের বেলার। কিন্তু আমাদের সিয়াম শুধু দিনের বেলার নয়, এটা দিনের ও রাতের। দিনে আমরা খাওয়া-দাওয়া বর্জন করি, কিন্তু রাতে আমরা ক্বিয়াম করি, আরো ইবাদত করি, অনেক কিছু অর্জন করি। দিনের বেলায় যেমন হারাম কিছু করি না, রাতের বেলায়ও হারামের ধারে কাছে যাই না। ফলে, সিয়াম ও রোজা এক অর্থ দেয় না। সিয়ামের অর্থ রোজার চেয়েও অনেক ব্যাপক। ফলে, আমরা ব্যাপক অর্থবোধক কোরআন ও সুন্নাহতে ব্যবহৃত পরিভাষাটা বাদ দিয়ে কেন মানুষের দেওয়ার কম অর্থপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করতে যাব? 
৩- আমরা বলব ইফতার বা ফুতুর, ইফতারি নয়। 
হাদীসে আল-ইফতার শব্দটা এসেছে ১৮৭ বারের বেশী। আল-ফুতুর শব্দ এসেছে ৪ বার। ফলে, আমরা বলি ইফতার। ইফতারীটা আরবি থেকে নেওয়া হলেও এটা আর আরবি থাকে নি। কারণ ইফতারী মানে হলো ইফতার বিষয়ক। কেউ কেউ এটাকে বলেন ইস্তারী। যেটা ইফতারীর অপভ্রংশ। 
৪- তারাবিহ বা ক্বিয়ামুল লাঈল। 
হাদিসে ক্বিয়ামুল লাঈল পরিভাষাটা এসেছে প্রায় ২২৫ বার। আর তারাবিহ শব্দটা এসেছে ৭ বার। রামাদানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ক্বিয়ামুল লাঈলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। ফলে, হাদীসে এই পরিভাষাটাই বেশি পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে বিশ রাকায়াতের তারাবিহর প্রচলন ওমরা (রাঃ) এর খেলাফত থেকে শুরু হওয়ার কারণে ক্বিয়ামুল লাঈল পরিভাষাটা কম ব্যবহার করেছেন ফক্বীহ বা মুফতিরা। আমার মনে হয় ক্বিয়ামুল লাঈল বললে তারাবিহ পরিভাষাটাও চলে আসে। কিন্তু তারাবিহ বললে ক্বিয়ামুল লাঈল বা তাহাজ্জুদটা কম গুরুত্ব পায়। অথচ ক্বিয়ামুল লাঈল হলো সারা বছ জুড়ে রাতের শ্রেষ্ট নফল সালাত, আর রামাদানে এসে সেটা হয় রামাদানের শ্রেষ্ঠ নফল। কেউ কেউ বলেন তারাবিহ হলো রামাদানের ক্বিয়ামুল লাঈল। আমি এই মতের পক্ষের তেমন শক্তিশালী কোন দলীল পাই নি। ফলে, তারাবিহ না পড়লেও ব্যক্তিগত ক্বিয়ামুল লাঈলের সালাত যে গুরুত্বপূর্ণ সেটাই সাব্যস্ত কথা। 
৫- আমরা বলব- সুহূর বা সাহূর, সেহরি বা সাহরি নয়। 
অথবা বলব- আল-গাদা আল-মোবারক। 
কোরআনে সুহূর বা সাহূর পরিভাষা একবারও ব্যবহার করা হয় নি। এই শব্দ থেকে উদ্ভূত যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সে গুলো সব যাদু করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 
হাদীসে সুহূর বা সাহূর শব্দ এসেছে ৩০০ বারের বেশি। 
সেহরি বললে এটা যাদুর অর্থে চলে যেতে পারে। হাদীসে সাহূর বা সুহূর শব্দ থাকতে আমরা এমন শব্দ কেন ব্যবহার করব যেটা একটা হারাম কাজের (যাদু) সাথে সম্পর্কিত হয়ে যায়? 
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন ওমর বিন খাত্তাব আমাকে সাহূর খাওয়ার দাওয়াত দেন এবং বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম এটার নাম দিয়েছেন – আল-গাদা আল-মুবারক (আল-মুজাম আল-আওসাত- তাবারানী ১/১৬০, তারীখে বাগদাদ ১/৪০৪)। 
অবাক করার বিষয় হলো- আমাদের মুসলিম সমাজের খুব কম লোক আছেন যারা জানেন যে সিয়ামের জন্যে ফজরের আগে যে বরকত ময় খাবার আমরা খাই সেটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম নিজেই আল-গাদা আল-মুবারক বলতেন। আমরা বাংলায় এটাকে বলতে পারি গাদা মুবারক। কত অর্থপূর্ণ পরিভাষা। অথচ এটাকে আমরা সেহেরি বলে যাদুর সাথে মিলিয়ে ফেলেছি। ভালো শব্দ রেখে এমন একটা আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করার কি যুক্তি থাকতে পারে?
৬- আমরা বলব- যাকাতুল ফিতর বা যাকাতুল ফিতর, শুধু ফিতরা বা ফিতরানা বলব না। 
হাদীসে যাকাতুল ফিতর পরিভাষাটা ব্যবহার হয়েছে প্রায় ২৫২ জায়গায়। আর সাহাক্বাতুল ফিতর পরিভাষা এসেছে প্রায় ২২৭ জায়গায়। 
এতে করে আমরা সবাই বুঝতে পারব যে যাকাত যেমন দেওয়া ফরয, যাকাতুল ফিতর দেওয়াও তেমন দরকার (ফরয বা অয়াজিব)। 

আশাকরি, আমরা এই ছোট ছোট শব্দগুলো ব্যবহার করে আল্লাহ তায়ালার ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম) শব্দের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবো। আমাদের এই সামান্য ভালোবাসা আল্লাহ কবুল করলে আমাদের মুক্তি সহ অনেক বড় কল্যান হতে পারে। আমীন।


মাসিক দাওয়াহ রামাদান সিয়াম