করোনা, কোয়ারেন্টাইন: কোথায় কীভাবে ঈদের নামাজ পড়বেন

এমডি ডেস্ক




করোনা, কোয়ারেন্টাইন, লগডাউনে 
ঈদের নামায কোথায় পড়বেন? কীভাবে পড়বেন? 

প্রফেসর ড. বি এম মফিজুর রহমান আল আযহারী 

الحمد لله رب العالمين. والصلاة والسلام على سيد المرسلين. نبينا محمد وعلى آله وسلم: 

একদিকে চলছে করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ, অন্য দিকে আমাদের দুয়ারে এসে হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের অন্যতম অনুসঙ্গ হচ্ছে, ঈদের নামায। হিজরী প্রথম সালে এ নামায প্রবর্তিত হয়। হযরত আনাস বিন মালিক (রা. ) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটি এর প্রমাণ: 
قدِمَ النَّبيُّ صلَّى الله عليْهِ وسلَّمَ المدينةَ ولأهلها يومانِ يَلعبونَ فيهِما فقالَ: ما هذانِ اليومانِ؟ قالوا: كنَّا نَلعبُ فيهِما في الجاهليَّةِ فقالَ النبيُّ صلَّى الله عليْهِ وسلَّمَ: قد أبدلَكُمُ الله بِهما خيرًا منْهُما: يومَ الأضحى ويومَ الفِطرِ. أخرجه أحمد والنسائي 
“রাসূল (স.) মদীনায় আগমনের পর দেখলেন, সেখানকার লোকেরা বছরে দুটো দিন খেলাধুলা আমোদ প্রমোদ করে? তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই দুটো দিন কিসের? তারা বললো, জাহেলী যুগে এই দুই দিন আমরা খেলাধুলা আনন্দ ফূর্তি করতাম। তখন রাসূল (স.) তাদেরকে বললেন: আল্লাহ এই দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদেরকে আরো উত্তম দুটো দিন দান করেছেন। একটি হলো: ঈদুল ফিতর। আরেকটি হলো, ঈদুল আদহা।” 
অবশ্য রাসূল প্রথম ঈদের নামায আদায় করেছেন হিজরী দ্বিতীয় সালে। 
স্বাভাবিক অবস্থায় সাধারণত ইদগাহে/মসজিদে জামাতের সাথে এই নামায আদায় করতে হয়। এটা ইসলামের একটি প্রতিভূ /শায়ীরা পর্যায়ের ইবাদাত। এই নামাযের শেষে খুতবারও বিধান আছে। এভাবেই আমরা যুগ যুগ ধরে ঈদের দু’ রাকাত ওয়াজিব নামায আদায় করে আসছি। 
কিন্তু এবারের করোনা পরিস্থিতিতে লগ ডাউনের কারণে ঈদের জামাতের উপর বেশ কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যা আমাদের কাছে সুবিদিত। এটা কমবেশি সব দেশেই করা হয়েছে। 

এখন প্রশ্ন হলো: যারা মসজিদে যেতে পারবে না অসুস্থতার কারণে কিংবা সংক্রমণের আশংকায় যারা জামাত তরকের রুখসাত গ্রহণ করে ঘরে অবস্থান করবেন, তারা ঈদের নামায কিভাবে আদায় করবেন? 

এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত কথা হলো: 

মহামারী পরিস্থিতিতে ঈদের নামায ঘরের মধ্যে বসে পড়া যাবে কিনা এ ব্যাপারে ফিকহের কিতাবগুলোতে সরাসরি কোন আলোচনা আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসেনি। তবে আরেকটি মাসআলার সাথে এই মাসআলাটির হুবহু মিল থাকায় ঐ মাসআলাটির বিধান আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পোরে।
 
সেই মাসআলাটি হলো, من قاتته صلاة العيد مع الأمام অর্থাৎ (কোন কারণে ) ইমামের সাথে কেউ যদি ঈদের নামায পড়তে না পারে। ছুটে যায়। তাহলে সে কী করবে? 
আসুন, দেখা যাক, এ ব্যাপারে গবেষক ও ইমামগণ কী বলছেন? 

এ ব্যাপারে উলামাদের একাধিক অভিমত রয়েছে। তবে দুটো অভিমত 
সবচেয়ে বলিষ্ঠ: 

প্রথম অভিমত:  ইমামের সাথে যার ঈদের নামায ছুটে যায় এবং অন্য ইমামের পেছনে গিয়েও ধরতে না পারে, সে তা আর কাযা করবে না। বরং সে চাইলে দুহা/চাশতের নামাযের মত চার রাকাত নফল নামায আদায় করতে পারে। অর্থাৎ  তা ঈদের নামাযের অনুরূপ হবে না। 
তাতে কোন অতিরিক্ত তাকবীর বা খুতবা থাকবে না। 
এটি হচ্ছে হানাফী মাযহাবের ফকীহদের অভিমত। 
এই মতের দলীল হলো: 
ক. হযরত ইবনু মাসঊদ (রা.) এর কথা। তিনি বলেছেন: 
من فاته العيد، فليصل أربعا، ومن فاتته الجمعة فليصل أربعا. 
“যার ঈদের নামায ছুটে যায়, সে যেন চার রাকাত নামায পড়ে নেয়। তদ্রূপ যার জুমুআর নামায ছুটে যায়, সে যেন চার রাকাত নামায পড়ে নেয়। 
খ. ইমাম কাসানী বলেন: 
لأنها إذا فاتت لايمكن تدراكها بالقضاء، لفقد الشرائط، فلو صلى مثل الضحى، لينال الثواب كان حسنا. لكن لايجب لعدم دليل الوجوب. 
“শর্তাদির অনুপস্থিতির কারণে ছুটে যাওয়া ঈদের নামায কাযার মাধমে পুষিয়ে নেয়ার কোন সুযোগ নাই। তবে যদি সে সাওয়াব লাভের আশায় দুহা/চাশতের মত করে নামায পড়ে নেয়, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। তবে তা ওয়াজিব নয়, যেহেতু, এর স্বপক্ষে কোন দলীল নেই”। 
গ. 
هي قائمة مقام صلاة الضحي، ولهذا تكره صلاة الضحى قبل صلاة العيد، فإذا عجز عنها يصير إلى الأصل، كالجمعة إذا فاتت فإنه يصير إلى الظهر. 
ঈদের নামায মূলত দুহা/চাশতের নামাযের স্থলাভিষিক্ত। এ জন্যই ঈদের নামাযের পূর্বে দুহার নামায পড়া মাকরূহ। অতএব, ঈদের নামায ছুটে গেলে তা আবার আসল অবস্থায় ফিরে আসবে, তা হলো দুহার নামায। যা মূলত অনিবার্য নয়। যেমন, জুমুআর নামায ছুটে গেলে যোহরে পর্যবশিত হয়। 
তাই ব্যক্তিকে ইখতিয়ার  দেয়া হবে, সে ইচ্ছা করলে পড়তে পারে। ইচ্ছে করলে নাও পড়তে পারে। 

দ্বিতীয় অভিমত: 
যে ব্যক্তির ঈদের নামায ছুটে যায়, সে তা অতিরিক্ত তাকবীর সহ ঈদের নামাযের ছূরতেই কাযা করে নেবে। তা হতে পারে একাকী। কিংবা জামাতে। 
এটিই হচ্ছে ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম বিন হাম্বলের  মাযহাব। 
ইকরামাহ, আতা, ইবনু সিরীন, কাতাদাহ, মুআম্মার, ইব্রাহীম নাখাঈ ও হাম্মাদ (রা.) প্রমুখ মনীষী থেকেও এই অভিমত পাওয়া যায়। মুসাননিফে ইবনু আবি সাইবাহ, মুসাননিফে আব্দুর রাজ্জাক , সুসানে বায়হাকীর মধ্যে  এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অভিমতের পক্ষে দলীল হিসেবে যা পেশ করা হয়: 
১. 

ইমাম বায়হাকী হযরত উবায়দুল্লাহ বিন আবি বকর বিন আনাস থেকে রেওয়ায়েত করেন: 
[ كان أنس إذا فاتته صلاة العيد مع الإمام، جمع أهله فصلى بهم مثل صلاة الإمام في العيد ].
“ইমামের সাথে ঈদের ছুটে গেলে হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে ইমামের মত করেই ঈদের নামায আদায় করতেন। 
এরপর ইমাম বায়হাকী বলেন: 
 ويذكر عن أنس بن مالك أنه كان بمنزله بالزاوية فلم يشهد العيد بالبصرة جمع مواليه وولده ثم يأمر مولاه عبد الله بن أبي عتبة فيصلي بهم كصلاة أهل المصر ركعتين ويكبر بهم كتكبيرهم ]
 জানা যায় যে, হযরত আনাস বিন মালিক যাভিয়া নামক স্থানে তার বাড়ীতে ছিলেন। বসরায় ঈদের জামাতে অংশ নিতে পারেন নি। তাই তিনি তার পরিবারের সবাইকে ও দাসদাসীদেরকে কে একত্রিত করে তার আযাদকৃত দাস আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন উতবাহকে আদেশ করলে তিনি তাদেরকে নিয়ে দু রাকাত নামায আদায় করেন এবং তাতে তাকবীর দেন। 

ইমাম বুখারী  باب إِذَا فَاتَهُ الْعِيدُ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ وَكَذَلِكَ النِّسَاءُ وَمَنْ كَانَ فِي الْبُيُوتِ وَالْقُرَى لِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (هَذَا عِيدُنَا أَهْلَ الْإِسْلَامِ) নামক অধ্যায়ে  মুআল্লাক হাদীস হিসেবে  উল্লেখ করেন: 
وَأَمَرَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ مَوْلَاهُمْ ابْنَ أَبِي عُتْبَةَ بِالزَّاوِيَةِ فَجَمَعَ أَهْلَهُ وَبَنِيهِ وَصَلَّى كَصَلَاةِ أَهْلِ الْمِصْرِ وَتَكْبِيرِهِمْ.
“যাভিয়া নামক জায়গায় বসে আনাস বিন মালিক আযাদকৃত দাস ইবনু ‘উতবাহকে আদশে করলে তিনি তার আহাল-পরিবাবর ও ছেলেদের কে নিয়ে শহরের মত করেই তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করেন। 
হাফিজ ইবনু হাযার বলেন, 
 أن أثر أنس المذكور قد وصله ابن أبي شيبة في المصنف، وقولـه “الزاوية” اسم موضع بالقرب من البصرة كان به لأنس قصرٌ وأرضٌ وكان يقيم هناك كثيراً.
আনাস বিন মালিকের এই মুআল্লাক হাদীসটি ইবনু আবি সাইবাহ তাঁর মুসাননিফের  মধ্যে সনদসহ উল্লেখ করেছেন। আর যাভীয়াহ হচ্ছে বসরার নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম। সেখানে আনাস বিন মালিকের বাড়ী-ঘর, জমি-জায়গা ছিলো। সেখানে তিনি প্রায়ই অবস্থান করতেন। 

  ২. রাসূল (স.) ইরশাদ করেন: 

(إذا أتيتم الصلاة فامشوا وعليكم السكينة والوقار فما أدركتم فصلوا وما فاتكم فاقضوا) 

“তোমরা ধীরে-সুস্থে, ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণভাবেনামাযে যাবে। অতঃপর যা পাবে তা পড়বে এবং যা ছুটে যাবে তা কাযা করবে”।

আমরা কী করবো? 
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, আমাদের সামনে এখন দুটো অপশন আছে। এদের  যে কোন একটি আমরা গ্রহণ করতে পারি। 
ক. ঘরে বসে ঈদের নামায না পড়ে চার রাকাত দুহা/চাশতের নামায আদায় করা। 
খ. একা একা অথবা বাসার সবাইকে সাথে নিয়ে জামাতে অতিরিক্ত তাবীরের সাথে খুতবাহ ছাড়া ঈদের নামায আদায় করা। 
আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রায় সব আলেম এই দ্বিতীয়টি মতটি গ্রহণ করেছেন। কারণ: 
১. বর্তমান করেনাময় কঠিন পরিস্থিতির জন্য এটিই অধিক সমীচিন অভিমত। 
২. জীবন ও সম্পদহানীর আশংকায় যেখানে ফরয নামায ঘরে বসে পড়ার অনুমতি আছে, সেখানে ওয়াজিব/সুন্নাহ মুআক্কাদাহতো ঘরে বসে পড়ার অনুমতি থাকাটাই স্বাভবিক। 
৩. ওজরের কারণে যারা ঘরে বসে পড়বে, তারা ইনশাআল্লাহ পুরো সাওয়াবই পাবেন। এটাই হাদীসের শিক্ষা। তাবুকের অভিযানকালে রাসূল  (স.) বলেছিলেন: 
“মদীনায় কিছু লোক আছে, তোমরা যত উপত্যকা আর দূরত্ব অতিক্রম করেছো, তারা তোমাদের সাথেই আছে। তারা বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ তারাতো মদীনায় আছে?!
রাসূল (স.) বললেন, তারা মদীনাতে আছে, এটা ঠিক। তবে তাদেরকে ওজর আটকে রেখেছে”। 
অর্থাৎতারা ওজরের কারণে আসতে পারে নি। কিন্তু তাদের আসার খাটি নিয়্যাত ছিলো। তাই তারা না এসও তোমাদের সাথেই আছে। 
৪. ইমামদের ইখতিলাফ হলো মূলত রহমাত। ইমামগণ পরস্পনরকে মতভিন্নতা সত্বেও শ্রদ্ধা করতেন। এমন কি অন্যের সম্মানার্থে অনেক সময় নিজের মতকেও সাময়িকভাবে ছেড়ে দিতেন। যেমন, ইমাম শাফেয়ী (র.) একবার আবু হানীফাহ (র.) এর কবরের পাশ্ববর্তী স্থানে বসে ফজরের নামায আদায় করতে গিয়ে কুনুত ছেড়ে দিয়েছিলেন। অথচ তার মতে, ফজরে কুনুত পড়া ওয়াজিব। এ ব্যাপারে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন:  كيف أخالفه وأنا في حضرته؟“তাঁর সামনে বসে আমি তার বিরোধীতা করবো? 
ইমাম আহমাদ কে একবার প্রশ্ন করা হলো: আপনি কি ঐ ইমামের পেছনে নামায পড়বেন, যিনি রক্ত বের হওয়া সত্বেও অজু করেন নি? আহমাদ জবাব দিলেন: 
كيف لا أصلي خلف الإمام مالك وسعيد بن المسيب؟
আমি কিভাবে ইমাম মালিক ও সায়ীদ বিন মুসাইয়্যিবের পেছনে নামায না পড়ে পারি? অর্থাৎ ইমাম আহমাদ রক্ত বের হলে ওজু নষ্ট হয়ে যায় এই মতের প্রবক্তা ছিলেন। আর তারা ছিলেন ওজুর নষ্ট না হওয়ার প্রবক্তা। 
দেখুন, কি শ্রদ্ধাবোধ!!
তাই মাঝে মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থায় প্রয়োজনে উদারতা প্রদর্শন করে ইখতিলাফী রহমত থেকে কিছু রহমত সংগ্রহ করা উচিত। এতে দোষের কিছু নেই। যতক্ষণ এর দ্বারা শরীয়ত বিরোধী অসম্ভব কিছু পর্যবশিত না হবে। উদাহরণ স্বরূপ, বিভিন্ন মাযহাব থেকে সুবিধামত বিভিন্ন মত গ্রহণ করলে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে, যা কোন মাযহাবে নেই। 
উপসংহার: 
যারা ঘরে বাসে ঈদের নামায পড়বেন, তারা কীভাবে পড়বেন? 
ঈদের নামায অন্যান্য যে কোন   দুই রাকাত নামাযের মতই। শুধু পার্থক্য হলো, এতে  ছয়টি অতিরিক্ত তাকবীর বলতে হয়। প্রত্যেক তাকবীরের সাথে হাত তুলতে হয়। প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমার পর সানাহ পড়ে তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর আগে কিরাতের পর তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর। 
আল্লাহ আমাদের সিয়াম কিয়াম কবুল করুন। আমাদের সবাইকে করোনা সহ সমস্ত বিপদাপদ থেকে হেফাজাত করুন। 
والله أعلم بالصواب.
ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল-আযহারী
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।


মাসিক দাওয়াহ