গ্রিক সভ্যতায় নারী



আতাউর রহমান নাদভী




মানব সভ্যতার ইতিহাসে যেসব সভ্যতার অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সভ্যতা রয়েছে। অনুরূপভাবে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা বা Greek Civilization কয়েক হাজার বছরের পুরাতন একটি সভ্যতা। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী হতে শুরু হয়ে খ্রিস্টপূর্ব ১৬৪ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সভ্যতা। সেই সভ্যতা পৃথিবীর সকল জাতি গোষ্ঠীর কাছে আজও অতি মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ অতুলনীয় একটি সভ্যতা বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাই লেখক ও গবেষকরা নিজেদের লেখাকে পাঠকদের কাছে গ্রহণ যোগ্য এবং মূল্যবান করে তোলার জন্য এখনো উক্ত সভ্যতার উদাহরণ টেনে আনার প্রয়োজন মনে করেন। 

তবে আমরা যখন দেখতে পাই সেই গ্রিক সভ্যতার প্রাথমিক যুগে নারী আইন-কানূন, পারিবারিক-সামাজিক এবং চারিত্রিক দিক দিয়ে অধিকার বঞ্চিত ছিলো, তখন খুবই ব্যথিত হই। নারীর স্বাধীনতা বলতে সেই সভ্যতায়ও কিছু ছিলো না। নারীর জন্য এটি প্রয়োজনও মনে করা হয়নি। গ্রিক সভ্যতায় নারীদেরকে এমন কিছু কুঠরিতে রাখা হতো যেখানে আলো বাতাসের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। পথ-ঘাট এবং লোকালয় হতে বহু দূরে অবস্থান হওয়ায় নারীদের সাথে যোগাযোগ করাও দুষ্কর হতো। মূলতঃ এটি নারী নির্যাতন এবং নারী অবজ্ঞারই একটি বিকল্প ব্যবস্থা।

নারীর প্রতি অবিচারের বর্ণনা এখানেই শেষ নয়, প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় বাবা পরিবারের দায়িত্বশীল হতেন। তাই তিনি ইচ্ছে করলে নিজ মেয়েকে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দিতে পারতেন। বাবার অবর্তমানে ভাইও তার বোনকে বিক্রি করে দেয়ার অধিকার রাখতো। বাবার মৃত্যুর পর শুধুমাত্র ছেলেরা সম্পত্তির মালিক হতো। মেয়েরা কখনো বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওয়ারিস হতে পারতো না। তদানীন্তন সমাজের সকল শ্রেণীর মাঝে মেয়েদেরকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। আপন বাবা ও ভাইয়ের ইচ্ছে হলে যখন তখন হাটে-বাজরে বিক্রি করা যেতো। মোটকথা, সামাজিকভাবে নারীর কোনো অধিকারই ছিলো না। জন্ম হতে সমাজ ও পরিবারে এসব অত্যাচার সহ্য করার কারণে তারা নিজেরাও নিজেদের কোনো অধিকার সম্পর্কে ভাবতে পারতো না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাচ্যের বিখ্যাত দার্শনিক এরিষ্টটল (Aristotle 322 -384) ও নারী স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবে নারীর প্রতি ঠিকই তার আকর্ষণ ছিলো। তাই নারীর সান্নিধ্যে গিয়ে শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্য নিজের বিয়েটি কিন্তু ঠিকই সতের বছর বয়সে করে ফেলেছিলেন। তিনি নয়শ খ্রিস্টপূর্ব Sparta (9th -192nd BC) গ্রিক সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ একটি সমৃদ্ধ জাতির নারী অধিকার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তদানীন্তন মানব সমাজকে শহর কেন্দ্রিক প্রশাসনের আলো সর্ব প্রথম তারাই দেখিয়েছিলো। উপ শহরের দর্শন সর্ব প্রথম তারাই দুন্ইয়াবাসীর সামনে শুধু পেশ করেনি; বরং তারা এটিকে নিজেদের অঞ্চলে স্থাপন করে খুব সুন্দরভাবে সাজিয়েও ছিলো। এসুবাদে তারা নারীকে স্বাধীনতার কিছুটা আলো দেখিয়ে যুল্ম নির্যাতন হতে মুক্তির পথ বাতলে ছিলো। তবে তারাও পুরোপুরি মুক্তি দিতে পারেনি।

নারীকে দেখানো তাদের স্বাধীনতার মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখ যোগ্য বিষয় হলো, সেই সমাজেই নারী নিজ স্বামীকে ত্বালাক্ব দেয়ার অধিকার পেয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওয়ারিস হওয়ার সুযোগও পেয়েছিলো। এই সিঁড়ি বেয়ে নারীকে মানব সমাজে উঁচু হয়ে দাঁড়ানোর সাহস যুগিয়েছিলো স্পার্ট্রা নামক সেই জাতি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এরিষ্টটল সেই জাতির পতনের মূল কারণ হিসেবে নারীকে দেয়া স্বাধীনতাকেই চিহ্ণিত করেছেন।’  

গ্রিক সভ্যতার প্রায় সব দার্শনিকই নারীকে কখনো মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও দর্শনের অপব্যবহার করে সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এ কারণেই বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯) বলেছেন:
‘নারীর চেয়ে বেশী ফিত্না সৃষ্টিকারী দুন্ইয়াতে আর কেউ নেই। তিনি নারীকে এমন সুন্দর একটি বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন, যেই বৃক্ষটির ফল একটি পাখি খাওয়ার সাথে সাথে মরে যায়। তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, আমি যখনই যে বিষয়ে চিন্তা করেছি তখনই তার গভীরতাকে খুব সহজে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি নারীর স্বভাবকে সঠিক ভাবে পুরাপুরি বুঝতে পারিনি। নারী মানব সমাজে ফিত্না সৃষ্টি করার কতো বেশী শক্তি সামর্থ্য রাখে তা আমি এখনো জানতে পারলাম না। তাই আমি মনে করি, দুন্ইয়াতে যদি নারী সৃষ্টি না হতো, তাহলে দুন্ইয়া শান্তি ও নিরাপত্তার স্বর্গে পরিণত হতো। তিনি নারীদের যাদু ও তাদের ফিত্না হতে দূরে থাকার জন্য তার শিষ্যদেরকে সতর্ক করেছেন। এমন কি নারীর আবেগ ও অনুভূতিকে কখনো মূল্যায়ন না করার জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন। তা না হলে নারী তার ধোকাবাজিতে সফল হয়ে যাবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।’  

Encyclopedia Britannica তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় নারীদের স্থান ও মান মর্যাদা এতো বেশী নীচে ছিলো যে, তাদেরকে শুধুমাত্র বাচ্চা পালনকারী ক্রীতদাসী ও বাঁদীর মতো মনে করা হতো। তাই নারীদেরকে সব সময় ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখা হতো। তারা শিক্ষা হতে বঞ্চিত ছিলো। স্বামী তাদেরকে ঘরের জিনিস পত্রের  মতো নিজের ইচ্ছে মাফিক ব্যবহার করতো।’ 

এটিই হলো গ্রিক সভ্যতায় নারী জীবনের চিত্র। তারপরও তারা সাধু। কবির ভাষায় বলতে হয়:

‘আমি শুনে হাসি, আঁখি জলে ভাসি, এই ছিলো মোর ঘটে,
তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’

অতএব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আজকের মুসলিম উম্মাহ্র অনেকের কাছে তারাই আজ জগতের মহা পন্ডিত। তাই নারীর বর্তমান অবস্থা বুঝতে হলে উক্ত সভ্যতাসহ প্রাচীন সভ্যতায় নারীর পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় অবস্থান ভুলে গেলে চলবে না। 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, CENURC, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

 


মাসিক দাওয়াহ নারী