নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

মো: শহীদুল হক




নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

মো: শহীদুল হক

---------------------
এক সময়ে মিডিয়া 'ইভ টিজিং' নিয়ে রিপোর্ট করতো। এখন আর এ শব্দটির ব্যবহার নেই বললেই চলে। তার কারণও পরিষ্কার। বর্তমানে নারী নির্যাতনের মাত্রা এতো বেড়ে গেছে যে, ইভ টিজিং নিয়ে রিপোর্ট করার ফুরসত নেই মিডিয়ার। বিরামহীনভাবে চলছে ধর্ষণ। একের পর লোমহর্ষক খবর আমাদের অস্থির করে দিচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসায়ও ধর্ষণসহ নানা কায়দায় চলছে নারী নির্যাতন। শিক্ষকতার মহান দায়িত্বে থাকা শিক্ষকও নাম লেখাচ্ছে ধর্ষকের খাতায়। নিজ কন্যাকে পর্যন্ত ধর্ষণ করতে উদ্যত হচ্ছে বাবা। কী ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছে আজ! মানুষের আস্থার জায়গা বলে কিছু থাকছেনা। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন আজ অপবিত্র। নিজের ঠিকানা, নিজের ঘর আজ কলুষিত। অবস্থা এতটাই নাজুক যা ভাবাও যায় না, লিখতেও হাত কাপে। ধর্ষণ-নির্যাতনের কয়টি খবরইবা মিডিয়ায় আসছে? কত মা-বোন লুকিয়ে রাখছে তাদের নির্যাতনের খবর। কত ধর্ষিতা নীরবে নিভৃতে কাঁদছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। ধর্ষণ-নির্যাতন আজ মহামারীর রূপ নিয়েছে। আর এভাবে চলতে দেয়া যায়না। যেকোনো মূল্যে এ অবস্থা থেকে আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে হবে, বাঁচাতে হবে আমাদের প্রিয় দেশ। কারো একার পক্ষে জাতিকে এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই সবাই মিলে নিতে হবে সমন্বিত পদক্ষেপ।

১. যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের যথাযথ ব্যবহার করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী অপরাধীই। সরকারী দলের পরিচয়, ক্ষমতা বা অন্য কোনো প্রভাবে বা কোনো পরিচয়ে সঠিক বিচার যেন বাধাগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

২. মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ভিডিও প্লেয়ার বা এমন মোবাইল ডিভাইস দেয়া যাবে না, যার দ্বারা সে পর্নোগাফি বা অন্য কোনো অশ্লীল বা আসক্তিকর কিছু দেখতে পারে।

৩. উচ্চ পর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করতে হবে। পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। গান, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন মিডিয়া থেকে অশ্লীলতাকে চির বিদায় দিতে হবে।

৪. যেহেতু দর্শন থেকেও ধর্ষণের দিকে ধাবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, মিডিয়া ও বাস্তব জীবনের অনুষ্ঠানাদিতে শালীনতা বজায় রাখতে হবে।

৫. অবাধ যৌনাচার, অশ্লীল দৃশ্য বা যে কোনো যৌন উদ্দীপক দৃশ্য, অনুষ্ঠান বা বক্তব্য যে সকল ওয়েবসাইট, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও বা অন্য কোনো মিডিয়া উপস্থাপন করে, সেগুলোকে আমাদের দেশে নিষিদ্ধ করতে হবে।

৬. বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যাপকহারে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

৭. আইন সম্মত নয় এবং ধর্মীয়ভাবেও স্বীকৃত নয়, এমন অবাধ যৌনাচারে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই লিভ টুগেদারসহ বিবাহ বহির্ভুত সব ধরনের যৌনাচার বন্ধ করতে হবে।

৮. আমাদের দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বাস্থ্য শিক্ষা বা অন্য কোনো বিষয়ের মধ্যে 'যৌন শিক্ষা' দেয়া যাবে না।

৯. স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্ব স্তরে (শিশু শ্রেণী থেকে পিএইচডি পর্যন্ত) ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

১০.সকলের মধ্যে ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন মিডিয়া এবং সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে।

১১. যে দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ, বিশেষত মুসলমান, সে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম অবশ্যই হতে হবে শালীন। বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রবর্তিত বা প্রভাবিত অশালীন ইউনিফর্ম পরিবর্তন করতে হবে।

১২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেম বা অন্য কোনো নামে কেউ যেন প্রকাশ্য যৌনাচার করতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বহিরাগত এসে অনেক অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় এবং শিক্ষার পরিবেশ কলুষিত করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং বহিরাগতদের আগমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

১৩. বিভিন্ন অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং যাতায়াতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

১৪. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন বিরোধী সেল গঠন করতে হবে।

১৫. মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুসারে সব ধরনের জেনা-ব্যভিচারের পথ রুদ্ধ করতে হবে, বেপর্দেগী-বেহায়ায়ী বন্ধ করতে হবে এবং যথাযথভাবে পর্দা রক্ষা করতে হবে। নারীদের জন্য পৃথক নিরাপদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

১৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা শুধু নামেমাত্র নয় বরং সত্যিকারের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আচরণের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। যে সকল প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় নাম ব্যবহার করবে, তাদের অবশ্যই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা মেনে চলতে হবে। ধর্মের নামে গোঁড়ামী, ভন্ডামী ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়া যাবে না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগোযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মাসিক দাওয়াহ